Monday, November 02, 2020

বই কথা বলে: কাশগড় - ১

আমি লিখতে বসেছি, কারণ আমি জানি আমার লেখা দরকার, কিছু বলা দরকার। হয়তো কী বলতে চাইছি তা প্রকাশ করতে পারবো না, হয়তোবা লেখা পড়ে তুমি সুসাহসী আমার বোকামি দেখে মুচকি মুচকি হাসবে; তবু আমার কিছু বলা দরকার, আমার জন্যই দরকার। তোমার জন্যও..

অচছা, তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করি? তুমি কি আযান শুনে কখনো কেঁদেছ? হাসি আসছে? আচছা, একটু হেসে নাও, এখন তো পরিবেশ শান্ত আছে; কিন্তু আমার একটা অনুরোধ রাখবে? একটু পর যে আযান হবে, মন দিয়ে শুনবে, প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত; প্রতিটি শব্দ অনুভব করে..পারবে না?
আচছা, তুমি কখনো অনুভব করেছ; একটু পর পর 'আল্লাহু আকবার' ধ্বনি যে তোমার কানে বেজে ওঠে, তা কতটা সৌভাগ্যের, কতোটা আনন্দের?

আচছা, করোনাভাইরাসের অজুহাতে মসজিদগুলো যখন খালি হয়ে ছিল; আযান হতো, কিন্তু তাতে সাড়া দিয়ে কেউ মসজিদে যেতে পারতো না..তখন কি তোমার কান্না আসতো?
তুমি কি সত্যিই অনুভূতিহীন? আচছা, এক মুআজ্জিন যে ডুকরে ডুকরে কাঁদতে কাঁদতে আযান দিচ্ছিলেন, ওটা কি তুমি শুনছিলে? শাইখ আস-সুদাইস যে শূন্য মাসজিদুল হারামে ইমামতি করতে গিয়ে কাঁদছিলেন, ওটাও শোনা হয়নি? সবটাই কি তোমার কাছে অবিবেচকদের হাস্যকর কাণ্ডকারখানা ছিল?
আসলে কি জানো, ওটা বড় একটা সুযোগ ছিল নিজেকে, নিজের স্বরূপটা বুঝে নেবার..

১.

আচছা আমাকে বলবে, ঠিক কোন ভাষায় তোমাকে বোঝাতে পারবো? কোন ভাষায় বললে তুমি আমার কথাগুলো বুঝতে পারবে? আমাকে বলো, আমি ঠিক সে ভাষায় তোমাকে বলব। ঠিক সে ভাষায় বলবার চেষ্টা করবো, বিশ্বাস করো।

আচছা ভাই, তুমি কি সেই, যাকে পুরুষ বলে, যাকে মানুষ উম্মাহর কান্ডারী মনে করে? তোমাকে নিয়ে একটু কল্পনার জগতে ঘুরিয়ে নিয়ে আসতে চাই। যাবে? শুধু এতটুকু খেয়াল রেখো, তোমার কাছে এখন যা শুধু 'কল্পনা', তা-ই ঠিক তোমার মতো অনেকের কাছে চরম বাস্তবতা। চলো..

আচছা, কেমন লাগবে তোমার? যদি একটা শীতল চোখ তোমার চোখের দিকে তাকিয়ে তোমাকে খুব সাধারণ একটা প্রস্তাব দেয়, রাজি হও,নয়তো তোমার মাকে নিয়ে যাবো..কোথায়? তোমার জিজ্ঞাসা করার প্রয়োজন নেই, তুমি জানো তারা কোথায় নিয়ে যেতে চায়।

শীতল চোখের আহবান প্রত্যাখ্যান করা তোমার মেরুদণ্ড সহ্য করবে কীভাবে? তুমি রাজি হয়ে গেলে..তারপর, একে একে নিজের বোন, বোনের পরিবার, তার জীবনসঙ্গীর পরিবার, যাকে পারলে..কেউ হয়তো লুকিয়ে ছিলো, তাকে বের করে এনে তুলে দিলে তাদের হাতে, কেউ দেশের বাইরে ছিলো তাকে ডেকে এনে দিলে..শত শত মা, শত শত বোন; নিজ হাতে তাদের ভবিষ্যত্ গড়ে দিলে..

মনে হচছে বেশি বলছি? একটুও না, অনেক অনেক কম বলছি..আমি জানি অনেক কম করে বলছি, তবু বলছি..বলবো বলে, বলতে হবে বলে..

তারপর? যেদিন তোমার মাকে নিয়ে তারা উপস্থিত হতে বলল..সেদিন তোমার মন কী বলছিল? আমি নিশ্চিত, তোমার হৃদয় শূন্য ছিল..আমি বরং আরো যুক্ত করবো- আমাকে বলো, তোমার প্রাপ্য কী ছিল?

ভাই, দুটো অনুরোধ করবো, রাখবে? হয়তো হাসবে এখন, তবু মনে রেখো..

যদি অবস্থা চলে আসে, আল্লাহ না করুন, যদি চলে আসে কখনো আযান বন্ধ হতে দিও না..

একটু চোখ বন্ধ করে ভাবো, একটু নাহয় সময় নাও - সময় নিয়ে বিশ্বাস করে নাও; মুসলিম নামে যত বোন আছে, সবাই তোমার নিজের বোন; যতো মা আছে সবাই তোমার নিজের..

একটা কথা দিতে পারবে? যদি আল্লাহ না করুন, অবস্থা চলে এলে তুমি বেঁচে থাকতে একটা পশুও তোমাকে ডিঙিয়ে তাদের পর্যন্ত পৌঁছতে না পারে..কথা দিয়ে যাও, পারবে না?

https://www.aljazeera.com/features/2019/2/1/exposed-chinas-surveillance-of-muslim-uighurs

......

আচছা আপু, তোমাকে কোথাও ঘুরিয়ে আনবো না। জানো ভাবলে কেমন যেন লাগে, একসময় কিছু 'পুরুষ' ছিলেন; একজন নারীর ক্ষীণ আর্তনাদে তারা, শত শত বরং লাখ লাখ 'তাদের' জীবনবাজি রেখে দাঁড়িয়ে যাবার সাহস ছিল। কিন্তু এখন?

জানো কেমন কষ্ট লাগে, সাহাবীরা যখন হুযুর সা. এর সাথে যুদ্ধে বেরোতেন; রত্নের মতো করেই তারা নারীদের পিছনে সুরক্ষিত রেখে আসতেন। যুদ্ধের কদর্যতা তাদের ছুঁতে পারতো না। এখন যুদ্ধ মানেই...আর ঐ মহাপুরুষদের উত্তরপুরুষরা নিজ হাতে তাদের আত্মসম্মানবোধকে পশুর কাছে বিকিয়ে দিতে খুব বেশি কুন্ঠিত হয় না...

এখন তারা সামান্য দেশীয় হায়েনা থেকেই বাঁচাতে পারে না, আর কি বলার আছে? আর কি ব্যাখ্যা করার আছে?

ওরা হায়েনা নয়, অন্য কোন পশুও নয়; ওরা এমন, যার উপর যেকোন পশু মলত্যাগ করতেও ঘৃণা করবে...জানো, ওরা...

https://www.businessinsider.com/china-uighur-monitor-home-shared-bed-report-2019-11

থাক আর কিছু বলতে রুচিতে কুলাচ্ছে না। আমার সাথে একটা প্রতিজ্ঞা করবে? আল্লাহ না করুন, যদি অবস্থা চলে আসে, আমরা হাতে হাত ধরে শেকল তৈরি করবো। একজনকেও একলা নিতে দেব না; আমরা আলাদা করে কেউ হবো না, সবাই এক অস্তিত্ব হবো। পারবো না?

পারতে হবে না? আপু শোন, তুমি এখন নারী আন্দোলনের অগ্রদূত হতে পারো। কিন্তু জানো, ওরা কিন্তু বিচার করে না কে কতটা নারীবাদী হতে পারলো, কে পোশাকে কতটা উগ্র হতে পারলো, কে ওদের সভ্যতা কতোটা গ্রহণ করতে পারলো। ওরা কী দেখে জানো? ওরা সিসিটিভির ক্যামেরা জুম করে দেখে...তারপর নিয়ে যায়; যাদের নিয়ে যায়, তাদের কেউ ফিরে আসে, কেউ আসে না...

আপু তুমি যদি তাদের একজন হও, যারা এখন 'পশ্চাৎপদ' হতে চায় না বলে বরং আরো কিছু পশু তৈয়ার করছে, নিজ হাতে গড়ছে (ব্যাখ্যা করতে হবে কি?); হয়তো যেদিন প্রয়োজন হবে, তোমার হাত অতটা শক্ত করে ধরতে পারবো না...

২.

বইয়ের পিছনে লেখা 'দূর্বলচিত্তের জন্য নয়' । পড়তে গেলে মনে হয়, বুঝি গল্প পড়ছি, এমন গল্প যেটা লাইন বাই লাইন পড়া কোন সুরুচিসম্পন্ন মানুষের পক্ষে অসম্ভবের মতো।

তবু আমার পক্ষে যদি সম্ভব হতো, প্রতিটি লাইন প্রতিটি মুসলমানকে পড়াতাম। হয়তো তুমি হার্টের রোগী, হয়তো রাতে ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে যাবে, হয়তো খাবারের রুচি চলে যাবে, হয়তো বমি আসবে - তাতে কী?

আমাদেরই কেউ কেউ এক অজানা গোপন এক দুনিয়ায় বসে প্রাণপণে হয়তো চাইছে, আমি প্রায় নিশ্চিত তারা চাইছে, পুরোটা দুঃস্বপ্ন হোক। রুচির কথা বাদ দাও, এসব সস্তা রুচিবোধের গল্প করে কী হবে? তারা তো খাবারই পায় না; দিনে একবারের বেশি হাত ধোয়ার তাদের অধিকার নেই, কারাগারের কক্ষের এক কোনায় রাখা একটা বালতি ছাড়া আলাদা একটা বাথরুমের অধিকার নেই; সেই বালতিতেও দিনে দুমিনিটের বেশি অধিকার নেই...

একটু হলেও সচেতন হবে কি? আমরা মুসলমানরা তো এমনই, চোখে ঠুলি পরে আছি। আতঙ্ক, ঘৃণা দিয়ে যদি সচেতনতা আসে, তাহলে খারাপ কি?

......

আমরা ভুলে যাই, আমরা মুসলিম। ওরা ভোলেনা।

আমরা জানি না, আর আমাদের জানবার আগ্রহও নেই, আমাদের কাছে কী সম্পদ আছে; তবে ওরা জানে, খুব ভালোভাবে জানে।

আমরা ভুলে যাই, আমরা উম্মাহ, এক উম্মাহ। ওরা ভুলে না, ওরা কাদের নিকেশ করতে চায়।
আমরা দু'একটা স্যাড রিএক্ট করে, দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে, 'দুআ ছাড়া কিছু করার নেই' বলে দায়িত্বমুক্তির ভান ধরি। আর ওরা? প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধ্বংস করে, শেকড় উপড়ে দিয়েও জেনে রাখে 'কাজ বাকি আছে'।

যাদের কাছে পথ স্পষ্ট হয়ে গেছে, তবু যারা ভুলে থাকতে চায়, নিজেদেরকে ধোঁকায় ফেলে রাখতে ভালোবাসে; যাদের নেই আত্মমর্যাদাবোধ; যাদেরকে বুঝিয়ে প্রমাণ দেখিয়ে কোনভাবেই জাগানো যায় না; বিনা চাওয়ায় পাওয়া ইসলামরূপী রত্নের যারা কদর করতে জানেনা এবং চায়ও না; মাশুল যদি তারা না দেয়, তবে মাশুলের কোটা কার জন্য রাখা?

৩.

চেয়েছিলাম কিছু ভিডিও শেয়ার করে দিই, এতো 'নারীসমৃদ্ধ' আর 'মিউজিকসম্পন্ন' ভিডিওগুলো শেষ পর্যন্ত আর শেয়ার দিলাম না। কেউ চাইলেই বের করে নিতে পারে, যদি ইচ্ছে থাকে। যার ইচ্ছে নেই, কী বলার আছে?
কেমন যেন খারাপ লেগে উঠে। যারা দেখে শুনে বুঝে এসেছে, আমরা তো ওদের মতো করে কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না। ওরা কেউ কেউ সেসব অবস্থা পার হয়ে এসেছে, নিজের চোখে দেখে এসেছে...এসেও বুঝতে পারছে না(আমরাও পারছি না, জানিনা পারবো কিনা), কেন ওদের(আসলে আমাদের, আমাদের পুরো উম্মাহর) কেন এ পরিণতি, কেন এ অবস্থা?

আমরা অন্ধের মতোই...থেকেই যাই, থেকেই যাই...
ওদেরই অনুসরণ করতে চাই, নিজেকে জলাঞ্জলি দিতেই থাকি...মূর্খতার সাগরে...
ওদেরই অনুসরণ করতে থাকি...যারা দিনশেষে কড়ায় গন্ডায় ওদের অনুকরণের দাম শোধ করে যায়...

Wednesday, September 23, 2020

হঠাৎ দিনলিপি ১

একফাঁকে হঠাৎ দুটো একটা জীবন গল্প শোনা হয়ে যায়। কেন হয়? ঐ যে, নিজেকে নিজে থেকে বাঁচাতে। আল্লাহকে বন্ধু বানানোটা কেন যে হলো না এখনো।

শুনলাম, আর ভাবলাম - হায়রে! আমিও তো ঠিক এমনই এক বোকা। পার্থক্য হলো, আমি বুঝে বুঝে অনেকখানি স্বেচ্ছায় বোকামি করেছি বা করছি, আর কেউ করে একেবারে অন্ধবিশ্বাসে; যেটা করিনি সেটা হলো মনে হয় যেন আল্লাহ বাঁচিয়েছেন আর হয়তোবা কিছুটা মান-সম্মান বাঁচাবার খাতিরে। তারপরও, নাহ..আচ্ছা থাক কী হবে নিজেকে অ্যানালাইসিস করে।

আর একটা কথা, জানিনা কেন কথাটা এতো সত্য - কেউ যখন কারো প্রতি আগ্রহ দেখায় আর বিপরীতপক্ষ জিরো একটিভিটি দেখায় তখন সেই কেউ সবকিছু উজাড় করে সামান্য রেসপন্স পেতে চায়। কথাটা কিবরিয়া ভাই থেকে ধার করা। কিন্তু অসম্ভবভাবে সত্য..আবার যদি নিজেকে বিরত রাখা হয়, একটু দৃঢ়তা দেখানো হয় সেই বিপরীতপক্ষ হয়তোবা অনেকসময় আবার ঠিক একরকম আগ্রহ দেখায়। কিন্তু কেন?

কী হতো সহজভাবে কেউ কারো আগ্রহের মূল্য দিলে?..জানিনা, কিন্তু আল্লাহর সাথেই ব্যাপারটা ভিন্ন..সামান্য এগিয়ে যাও আল্লাহর অসামান্যভাবে এগিয়ে আসবেন..হেঁটে যাও আল্লাহ দৌড়ে আসবেন..তোমার আগ্রহ তুচ্ছ করলে আল্লাহর কিছু হারাবার ভয় নেই, তোমার আগ্রহে সাড়া দিলে তাঁর নিজের রাজত্বে কিছু বৃদ্ধি হবেনা..তিনিই সর্বোচ্চ অহংকারের অধিকারী..তবু যদি ডাকো, যদি একটু আগ্রহ করো; সাড়া দিবেন অভাবনীয়ভাবে..

তবু মানুষ তাকেই ভুলে যায়, আর আশা করে অহংকারী মাটির তৈরি পদার্থ থেকে, খুব জলদি যারা অনুগ্রহ ভুলে যায়..

তবে আল্লাহর 'বান্দা'রা কি আর একটু অন্যরকম হবে না? হবে না কেন?..চলোনা সবাই, তাঁরই বান্দা হই, বান্দী হই..

Sunday, August 02, 2020

এ অশ্রু কিসের?

বহুদিনের একটা প্রশ্ন ছিল মনে, মানুষ ইসলাম গ্রহণের সময় কাঁদে কেন। কেমন যেন স্বতঃস্ফূর্ত একটা কান্না কাঁদতে থাকে, শুধু সুখ-আনন্দের কান্না নয়; কেমন একটা আবেগের কান্না..ঠিক যেন বোঝা যায় না..

এই ভিডিওটা দেখে(পড়ুন 'শুনে') কিছুটা কি বুঝতে পারলাম?
 

আসলে ঈমানের একটা ভার আছে, অনেক ভার..আল্লাহ তা'আলা দয়া করে ঈমানী পরিবেশে, ঈমানী পরিবারে জন্ম দিয়েছেন..আমরা হয়তোবা তাই সেই ভার একটু একটু করে বহন করে অভ্যস্ত হয়ে গেছি, তাই সহসা উপলব্ধি করি না, করতে পারিনা..কিন্তু যাদের শূন্য, একেবারেই শূন্য হৃদয়ে কালিমার আলোকছটা হঠাৎ করে এসে পড়ে - তাদের হয়তোবা বুঝে আসে; ঈমানের সেই পূর্ণতার ভার হঠাৎ করে তাদের হৃদয় হয়তোবা সইতে পারে না, তাই হয়তোবা কাঁদতে থাকে..তাই হয়তোবা জড়িয়ে ধরবার মত একটা অবলম্বন লাগে..তাই হয়তোবা..

(অবশ্য আমরাও হঠাৎ কখনো এই ভার টের পাই, তাই না? কখনো আমাদের ঈমান বাড়ে, কখনো আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা বাড়ে, তাঁর উপস্থিতির অনুভূতি বাড়ে..তখন আমরাও হঠাৎ হঠাৎ কাঁদতে থাকি..

ইশশ্, যদি আমরা বুঝতাম কতো বড়, কতো মহামূল্যবান সম্পদের না চাইতেই অধিকারী হয়ে আছি..)

ইচ্ছে করে নিজ চোখে এই অনুভূতিগুলোর স্বাক্ষী হতে..

ঐ আয়াতগুলোর মনে পড়ে, (জানিনা যদিও এর সাথে সম্পর্ক আছে কিনা..) -

إِنَّا عَرَضْنَا الْأَمَانَةَ عَلَى السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَالْجِبَالِ فَأَبَيْنَ أَن يَحْمِلْنَهَا وَأَشْفَقْنَ مِنْهَا وَحَمَلَهَا الْإِنسَانُ ۖ إِنَّهُ كَانَ ظَلُومًا جَهُولًا  سورة الأحزاب ٧٢ -

অর্থ: আমি আকাশ পৃথিবী ও পর্বতমালার সামনে এই আমানত পেশ করেছিলাম, অতঃপর তারা একে বহন করতে অস্বীকার করল এবং এতে ভীত হল; কিন্তু মানুষ তা বহণ করল। নিশ্চয় সে জালেম-অজ্ঞ।

 لَوْ أَنزَلْنَا هَـٰذَا الْقُرْآنَ عَلَىٰ جَبَلٍ لَّرَأَيْتَهُ خَاشِعًا مُّتَصَدِّعًا مِّنْ خَشْيَةِ اللَّـهِ ۚ وَتِلْكَ الْأَمْثَالُ نَضْرِبُهَا لِلنَّاسِ لَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُونَ ﴿٢١﴾


অর্থ: যদি আমি এই কোরআন পাহাড়ের উপর অবতীর্ণ করতাম, তবে তুমি দেখতে যে, পাহাড় বিনীত হয়ে আল্লাহ তা’আলার ভয়ে বিদীর্ণ হয়ে গেছে। আমি এসব দৃষ্টান্ত মানুষের জন্যে বর্ণনা করি, যাতে তারা চিন্তা-ভাবনা করে।



Tuesday, April 21, 2020

ফিরে আসা প্রশান্তিতে

নিজের উপর বিরক্ত লাগছে নিশির। কিছুতেই আতঙ্ক কাটিয়ে উঠতে পারছে না। একবার ভালো করে বুঝাচ্ছে নিজেকেই , দেখো নিশি, এটা একটা মাখলুক। আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া এটা কিছুই করতে পারবে না তোমার । তোমার কাছেই ঘেষতে পারবে না..

কিন্তু কাজ হচ্ছে না কেন যেন। ঈমানী কথাগুলো মাথায় ঠিক ক্রিয়া করছে না। অস্থির অস্থির লাগছে, শরীরে-মনে। শেষমেষ একটা ধমকই লাগালো নিজেকে , কি হলো তোমার! এভাবে অস্থির অস্থির করে কী লাভ হচ্ছে! এভাবে কি মৃত্যু ঠেকাতে পারবে? প্রস্তুতিটাও তো নিতে পারবে না..

নাহ..মৃত্যুভয় নয়, নিজেকে বলে নিশি। মৃত্যু, কবর, হাশর - কোনকিছুই তার মাথায় খেলা করছে না। তাছাড়া স্ট্যাটিসটিক্সও দেখেছে। তুলনামূলকভাবে মৃত্যুহার তো কমই..কিন্তু কেমন অদ্ভুত আতঙ্কগ্রস্ত লাগছে। যেন বাড়ির বাইরে মিলিটারি এসে দাঁড়িয়ে আছে, যে কোন মুহূর্তে ঢুকে সব তছনছ করে দেবে।

ভাগ্যিস OCD(১) নেই নিশির , থাকলেও কেবল অর্ধেকটা আছে। পুরোটা থাকলে আর দেখতে হতো না..তার মনে হচ্ছে, সবকিছুর মধ্যে করোনা কিলবিল করছে, জামা-কাপড়, বিছানা, ল্যাপটপ থেকে বইপত্র সবকিছুতে। কোনমতে ঠেকিয়ে রেখেছে নিজেকে..আর কীই বা করবে! এখন বুঝি রুম শাওয়ার করা শুরু করবে? কভি নেহি ম্যান..

*

হইচই শুনে বই থেকে মুখ তুলে তাকালো নিশি। একটা ছেলে পড়ে গেছে বোধহয় কাদায় পিচ্ছিল খেয়ে। তাই এতো আনন্দ । একটু অন্য ভাবনায় ডুবে গেল । এই তো ছেলেগুলো কী সুন্দর হাসছে, খেলছে! কে বলবে ওদের মধ্যে কারো করোনা নেই ? শুধু ছেলেরা? ঐ তো একপাশে খেলছে মেয়েরাও। এতক্ষণ কানামাছি খেলছিল, এখন অন্য খেলার প্ল্যান চলছে বোধহয়। ঐ যে ফ্রক করা মেয়েটা , এক ফাঁকে জামায় নাক মুছে নিলো। আর ছেলেগুলোও..ঘামছে দরদর করে , কেউ শার্টের হাতায় , কেউ বা রুমালে-গামছায় মুখ মুছছে।

একটা শ্বাস ফেলে আবার বইয়ে চোখ ফেরালো নিশি। আতঙ্ক কাটাতে শেষমেষ বইয়েরই আশ্রয় নিয়েছিলো সে। তারপর আছর হতেই উঠে এসেছে ছাদে। ইদানিং বই কেনাই হচ্ছিল না..মামীমার কাছে টাকাটা হাদিয়া পেয়ে ভাবলো , আচ্ছা এবার কিছু বইই কিনি! কী ভাগ্য ! হাতে এসে মাত্র পৌঁছল প্যাকেটটা , তার দুদিন পরেই কার্ফু শুরু! কী যে সৌভাগ্য - বইগুলোর দিকে চোখ পড়লেই মনে মনে শুকরিয়া করে নিশি।

কিন্তু বইয়ে মন টিকছে না এখন, চোখ উঠিয়ে আবার রাস্তার দিকে তাকাল। সব স্বাভাবিক, কোন আতঙ্ক নেই কোথাও; নেই শংকা , ভয় , সচেতনতা তো বহুদূর!

মনে মনে হাসলো নিশি। এখনই যদি কেউ মাঠটা এক চক্কর ঘুরে গলির এমাথা-ওমাথা একবার টহল দিয়ে কাশতে কাশতে ঘোষণা দেয় যে , আমি করোনা। ব্যস , পুরো এলাকা নিশ্চিত ফাঁকা হয়ে যাবে। আসলে কিছু কিছু মানুষের সচেতনতা মনে হয় সম্ভাবনার আপেক্ষিকতার ভিত্তিতে কাজ করে । আর সম্ভাবনা নির্ধারিত হয় কী দিয়ে? হয়তো প্রত্যক্ষ জ্ঞান দিয়ে । হয়তোবা এ কারণেই করোনার বিস্তার সূত্রের জ্ঞান তাদের ক্ষেত্রে কাজ করে না । তবে একজন কাশির রোগীকে নির্দ্বিধায় একঘরে করে দেয়। আবার সন্দেহযুক্ত কেউ মারা গেলে তাকে এলাকায় দাফন করতেই ভয়! আচ্ছা, করোনায় মারা গেলে কি লাশ থেকে ভুরভুর করে করোনা বের হয়?

এক স্তরের মানুষকে লজিক বুঝানো যায় না; কেউ বুঝেও বুঝতে চায় না, কারো তাওয়াক্কুল আ’লাল্লহ এখন লজিকের আওতায় নেই। শত বুঝালেও তাঁদের মস্তিষ্ক করোনা ট্রান্সমিশনের মতো ব্যাপার উপলব্ধি করতে পারে না । আচ্ছা, আল্লাহ তাদের সাথে কীভাবে মুআমালা করবেন? তাদের তাওয়াক্কুলকে গ্রহণ করে তাঁর প্রতি তাদের ধারণা অনুযায়ী ব্যবহার করবেন , নাকি তাদেরকে করোনা ছড়াবার উসিলা হিসেবে নির্ধারণ করবেন?

বই বন্ধ করে আকাশের দিকে তাকালো নিশি। মনটা আস্তে আস্তে শান্ত হয়ে আসছে। পরীক্ষার আগের রাতে যদি কেউ আবিষ্কার করে তেমন কিছুই পড়া হয়নি অথবা মৃত্যুর সময় নির্দিষ্ট করে দিলে , যেমনটা কেউ কেউ শান্ত হয়ে প্রস্তুতি নেয়..মনে মনে বললো - 'আল্লাহ! তুমি কতো পবিত্র! আমরা তো তোমাকে ছেড়ে আসবাব নিয়ে থাকতে ভালোবাসি, আসবাব নির্ভর হতে চাই! তুমি দেখিয়ে দিচ্ছো , আমরা আসবাব গ্রহণেও কতোটা অপারগ! ' - চোখ ভিজে গেলো নিশির - 'আল্লাহ, যেভাবে ভালোবেসে আমাদের তুমিমুখী করে নিচ্ছো, তৌফিক দাও সেভাবেই ভালোবেসে যাতে তোমাকে অন্তরে অনুভব করে নিই..আজীবন..'

*

মুগ্ধ হয়ে সাবান মাখা হাত দুটোর দিকে তাকিয়ে আছে নিশি। নাহ , মুগ্ধতা হাতের সৌন্দর্যের কারণে না; তার মাথায় একটু আগে শিখা যে দুআটা ঘুরছে তার কারণে । ভাবছে , কে এতো সুন্দর এতো উপযুক্ত দুআটা চালু করেছেন! কী করে তিনি জানতেন যে, হাত ধোয়ার সাথে এ ধরনের একটা দুআর প্রয়োজন হবে!(২)..

ট্যাপ ছেড়ে দিলো নিশি-

(৩)اللهم اني اسالك اليمن و البركة و أعوذ بك من الشؤم و الهلكة

নিশির মন অনুসন্ধিৎসু হয়ে উঠছিল। ইশ! কতোদিন ধরে মন দিয়ে উযূটাও করা হয় না। এতক্ষণে মনে পড়লো , উযুর সাথে তো সমস্ত গুনাহও ধুয়ে চলে যায়। যত্ন করে বাকি উযু শেষ করলো নিশি। পা ধোয়ার সাথে সাথে খেয়াল হলো - আরে! উযুর পানি না শেফা! ধ্যাত ! বিরক্ত হলো নিশি নিজের উপরই, মগে উযু করার অভ্যাসটা এখনই করে ফেলতে হবে। আর 'পরে কখনো'র জন্য ফেলে রাখা যাবে না ।

মাগরিবের নামাযের পর সন্ধ্যার দুআগুলো নিয়ে বসলো নিশি । একইসাথে মুগ্ধতা, তৃপ্তি আর প্রশান্তি খেলা করছিল তার মনে। ধীরে ধীরে অর্থ মিলিয়ে মিলিয়ে উচ্চারণ করছিল সে -

(৪)حَسْبِيَ اللَّهُ لا إِلَـهَ إِلاَّ هُوَ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَهُوَ رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ

(৫)بِسْمِ اللَّهِ الذي لاَ يَضُرُّ مَعَ اسْمِهِ شَىْءٌ في الأَرْضِ وَلاَ في السَّمَاءِ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ

(৬)أَعُوذُ بِكلِمَاتِ الله التّامّاتِ مِن شَرّ مَا خَلَقَ

اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ الْعَفْوَ وَالْعَافِيَةَ فِي الدُّنْيَا وَالآخِرَةِ اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ الْعَفْوَ وَالْعَافِيَةَ فِي دِينِي وَدُنْيَاىَ وَأَهْلِي وَمَالِي اللَّهُمَّ اسْتُرْ عَوْرَاتِي وَآمِنْ رَوْعَاتِي وَاحْفَظْنِي مِنْ بَيْنِ  يَدَىَّ وَمِنْ خَلْفِي وَعَنْ يَمِينِي وَعَنْ شِمَالِي وَمِنْ فَوْقِي وَأَعُوذُ بِكَ أَنْ أُغْتَالَ مِنْ تَحْتِي




মন ভরে যাচ্ছিলো নিশির..

اللَّهُمَّ أَنْتَ رَبِّي لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ خَلَقْتَنِي وَأَنَا عَبْدُكَ

*

রাতে শুতে যাবার আগে ভালোবাসা নিয়ে একবার বইয়ের স্তুপের একেবারে উপরে তাকায় সে। নাহ! ধূলিমলিন নয় কিতাবটা, দুদিনে একবার হলেও তো হাতে নেয় সে তাকে..

শুয়ে পড়লো নিশি। সকালের আগেই উঠে পড়তে হবে , তার সাথে গল্প করবে না?

হুম, মৃত্যুকে সে ভয় পায় না। কেউ যদি তাকে হাতে ধরে, পদে পদে তাঁর ভালোবাসাকে স্মরণ করিয়ে দেয় , তারঁ ডাকে সাড়া দিতে ভয় কি তার? কিন্তু, তাঁর চিঠিটা বুকে নিয়ে যেতে না পারলে বড় আফসোস থাকবে..

……..তথ্যসূত্রঃ…...

১.Obsessive-Compulsive Disorder (OCD)। শুচিবায়ু।

২.উযূর অঙ্গগুলো ধোয়া/মাসেহ করার দুআগুলো হাদীস দ্বারা প্রমাণিত নয়। তবে বুযুর্গানে দ্বীন এগুলো পাঠ করেছেন বা করেন।(আহকামে যিন্দেগী)

৩.অর্থঃ হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট মঙ্গল ও বরকত কামনা করি এবং অমঙ্গল ও ধ্বংস থেকে পানাহ চাই।(আহকামে যিন্দেগী)

৪.অর্থঃ আমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট, তিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। আমি তারই উপর নির্ভর করি। তিনি মহা আরশের অধিপতি। (সুরা তওবা: আয়াত-১২৯)

৫.অর্থঃ আল্লাহর নামে, যার নাম (স্মরণের) সাথে আসমান ও যমীনে কোন কিছুই ক্ষতি করতে পারে না। আর তিনি সর্বশ্রোতা, মহাজ্ঞানী।(আবু দাউদঃ ৫০৮৮)

৬.অর্থ: আল্লাহর পরিপূর্ণ কালেমাসমূহের উসিলায় আমি তাঁর নিকট তাঁর সৃষ্টির ক্ষতি থেকে আশ্রয় চাই। (মুসলিমঃ ২৭০৯)

৭অর্থ: হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট দুনিয়া ও আখেরাতে ক্ষমা ও নিরাপত্তা প্রার্থনা করছি। হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট ক্ষমা ও নিরাপত্তা প্রার্থনা করছি আমার দ্বীনদারি ও দুনিয়ার, আমার পরিবার ও সম্পদের। হে আল্লাহ! আপনি আমার গোপন ত্রুটিসমূহ ঢেকে রাখুন, আমার উদ্বিগ্নতাকে নিরাপত্তায় পরিণত করে দিন। হে আল্লাহ! আপনি আমাকে হিফাযত করুন আমার সামনের দিক থেকে, আমার পিছনের দিক থেকে, আমার ডান দিক থেকে, আমার বাম দিক থেকে এবং আমার উপরের দিক থেকে। আর আপনার মহত্ত্বের উসীলায় আশ্রয় চাই আমি নিচ থেকে হঠাৎ ধ্বংস হওয়া থেকে।(আবু দাউদঃ ৫০৭৪)

৮সাইয়্যেদুল ইস্তেগফার। (বুখারী ৬৩০৬)

Saturday, August 17, 2019

গুরত্বপূর্ণ 'গুরত্ব'

নিজের গত কয়েকদিনের আচরণ দেখে, আর বাচ্চাদের আচরণ অবলোকন করে খুব উপলদ্ধ হলো এই জিনিসটা যে , মানুষ গুরত্ব চায়। এটা খুব বাস্তব সত্য অলিখিত সত্য যে মানুষ গুরত্ব চায়। আর এই ব্যাপারটা কেন্দ্র করেই হয়তো কতো সমস্যার উদ্ভব হয়। মানুষ গুরত্ব চায় ;তাই মানুষের কাছে আশা করে , দাবি করে ; আর যখন পূরণ হয় না , তখনই বিষণ্ন হয়ে যায় , মনোমালিন্যের সৃষ্টি হয় , আরো কতো কী..

ছোট ফাতিমা , মাত্র তিনমাস ; কেউ কথা বললেই যখন মনে করে তার সাথে কথা বলছে , অসম্ভব খুশি হয় , নিজেও কতো কিছু বলার চেষ্টা করে; যতটুকু সম্ভব , ততটুকু মাড়ি বিকশিত করে হাসতে থাকে। আর যখন কেউ কথা বলে না , আস্তে আস্তে মলিন হতে থাকে , ছটফট করে , খুব বেশিক্ষণ থাকতে পারে না । এ তো সবসময়ই হয়। কিন্তু যখন থেকে গুরত্বের কথা ভাবছি , মাথায় স্ট্রাইক করলো; দেখো , এর তো জটিলরকম চিন্তা-ভাবনাও শুরু হয়নি , এখনই স্বতস্ফূর্তভাবে কতোটা গুরত্ব চায়..তার মানে 'গুরত্ব চাওয়া' জিনিসটা মানুষের একদম প্রকৃতিগত ব্যাপার..তার মানে যদি কাউকে গুরত্ব দিই, তার কতোটা কাছে হয়ে যেতে পারি..

শুধু ছোট ফাতেমাই না ; তার বড় ভাইয়ারাও যদি একটু সমস্যা করতে থাকে, প্রথমে যে কথাটা চলে আসে , ওর দিকে একেবারে মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে না..বাচ্চাদের অনেক সমস্যার ক্ষেত্রেই সমাধানের জন্য যে পরামর্শটা শুনি, ওকে গুরত্ব দিন ,ওকে সময় দিন..কিছু কিছু মানুষ বাচ্চাদের একেবারে প্রিয় থাকে, এর কারণ তারা বাচ্চাদের সাথে অন্যরকম গুরত্ব দিয়ে কথা বলে (নবীজীও এমন ছিলেন, তাই না? একসময় আমার মনে হতো, নবীজী যদি থাকতেন ; কোন কষ্ট হতো না আমার)

হয়তো ভাবছেন , বাচ্চাদের গুরত্ব দেওয়া নিয়ে এতো কথা কেন। আসলে কী , যখন গুরত্ব দেওয়া নিয়ে ভাবা শুরু করলাম আর বাচ্চাদের দিকে ফোকাস গেলো , তখন মনে হলো তাদের যে আচরণ তা একেবারে অকৃত্রিম । বড় মানুষ কতোটা লুকিয়ে রাখতে পারে , বাচ্চারা তো যা করে তাই অকৃত্রিম, নির্ভেজাল - তাদের দেখে মানবসত্তার আসল রূপ হয়তো অনেকটা বুঝে ওঠা যায়।

একটা খুব গুরত্বপূর্ণ শিক্ষা পেয়েছিলাম , কারো থেকে কিছু আশা করো না। শিক্ষাটা কাজে লাগিয়ে অনেকদিন শান্তিতে ছিলাম। ধরেই নিতাম , কেউ আমাকে গুরত্ব দেবে না। ব্যস আশা করতাম না , আশাভঙ্গের ব্যাপারও ছিলো না। মনে কষ্টও ছিলো না , মনে হতো আমার থেকে সুখী নেই কেউ। গত কয়েকদিনে একটু চিন্তা করলাম , কাউকে এতো জ্বালাচ্ছি কেনো । তারপর মনে হলো , যখন মন নিউট্রাল করে বসে ছিলাম , সে মাত্রাতীত গুরত্ব প্রকাশ করে আমাকে তার অনেকটা মুখাপেক্ষী করে নিয়েছে ; সেজন্যই এতো সমস্যা..

তাহলে? যখন কেউ কাউকে গুরত্ব দেয় , সে আপন থেকে আপনতর হয়ে যায়। হুযুর (স) এভাবেই মানুষের মন জয় করে নিতেন । তিনি যখন কারো সাথে কথা বলতেন , তার মনে হতো তাকেই তিনি সবচেয়ে বেশি গুরত্ব দিচ্ছেন। সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে কারো কথা শুনতেন।

আল্লাহ ভালো জানেন , এ জন্যই হয়তো খুব দ্রুত আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়া সম্ভব। আল্লাহ অসম্ভব ভালোবেসে আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। আমাদের পদে পদে নাফরমান হওয়া , হঠকারিতা করা ; আর তার অসীম নিআমতে ডুবিয়ে রাখা , হঠাৎ হঠাৎ একটু একটু কষ্ট দিয়ে কাছে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করা - এটা তাঁর ভালোবাসা নয়তো কী?

একটা বয়ানে পড়েছিলাম , আল্লাহ বলেছেন - যদি আমার নাফরমান বান্দারা জানতো , আমি তাকে কতো ভালোবাসি তবে তাদের হাত পা ছিন্নভিন্ন হয়ে যেতো। তাহলে?

এমন বর্ণনাও আছে , যখন কেউ নামাজে দাঁড়ায় আর অন্যদিকে মনোযোগ দিয়ে রাখে , আল্লাহ বারবার তাকে ডাকতে থাকেন যে  , হে আমার বান্দা ! আমাকে ছেড়ে তুমি কোথায় মনোযোগ দিয়ে রেখেছ?

আল্লাহ তা'আলার সার্বক্ষণিক মনোযোগ আমার দিকে। মনের নিভৃতে হঠাৎ ছোট্ট করে 'আল্লাহ' বলে ওঠাটাও তাঁর মনোযোগ এড়ায় না। আর আমার নিরাপত্তা আমার ভালো থাকার জন্য কী করে রেখেছেন , প্রতিমুহূর্তে আরো কী কী দিচ্ছেন ; তা শুধু ভাবতেই থাকা যায়। বিলীন হতে হলে , এমন সত্তার জন্যই বিলীন হওয়া দরকার। জীবন সাজাতে হলে , এমন সত্তার জন্যই সাজিয়ে নেওয়া দরকার..

আর একটু যদি ভাবি , সৃষ্টির দেওয়া গুরত্ব যদি আমাকে ভালো রাখে , যদি আমাকে আত্মবিশ্বাসী করে - তবে স্রষ্টার গুরত্ব আমাকে কেন ভালো রাখবে না , কেন আমি আত্মবিশ্বাসী থাকবো না? তিনি তো আছেন , মিথ্যা নন..তার ভালোবাসাও মিথ্যা নয়..
আর একটা কথা, তিনি চান আমরা তাঁকে মনোযোগ দিই , তাঁর কথা ভাবি। তবে একটু চিন্তা করি , যদি কোন মাখলুককে সামান্য গুরত্ব দিয়ে আপন থেকে আপনতর করতে পারি ; তবে আমার খালিকের কথা একটু গুরত্ব দিয়ে যদি ভাবি , বিবেচনা করি..তাহলে..
শুধু দরকার একটু চিন্তা , একটু ফিকির..
আর পরিশেষে তো তিনিই..

Thursday, March 14, 2019

ক্বুরআনের সাথে

ক্বুরআন বৈয়াকরণের জন্য ব্যাকরণগ্রন্থ - সম্ভবত ক্বুরআনের কোন সংজ্ঞায় কথাটা পড়েছিলাম। কিন্তু তখন মানেটা তেমন করে বুঝে আসেনি। তারপর যখন আল্লাহ তৌফিক দিলেন আরবী শিখা শুরু করবার - মানেটা আস্তে আস্তে আশ্চর্যরকম বুঝে এল । 

ক্বুরআন আশ্চর্য এক তামরীন বা অনুশীলনগ্রন্থ। যে নিসাবই ব্যবহার করে পড়ো না কেন, যতটুকুই শিখো না কেন; যদি ক্বুরআন পাঠ চালু রাখো, যদি কিছুটা অনুশীলনের নিয়তে পড়ো - দেখবে ইনশাআল্লাহ ক্বুরআনই তোমাকে তা ভুলতে দেবে না। এমনকি, সাধারণভাবে শিখেও যেসব ভুল হওয়া সম্ভব - দেখা যাবে , ক্বুরআনই তোমাকে তা থেকে বাঁচিয়ে দিচ্ছে।
ধরো, তুমি মাউসুফ সিফাত নতুন শিখলে। এখন তুমি ক্বুরআন পড়তে গিয়ে কতশত ব্যবহার যে তার দেখবে। একসময় তুমি এমন অভ্যস্ত হবে যে, দেখবে মাউসুফ সিফাতে ভুল করা সম্ভবই হচ্ছে না।
শুধু তাই নয়, হয়তো নতুন নতুন ব্যবহারও শিখবে। 

এভাবে নতুন নতুন বাব শিখো, ইন শিখো, ইন্না শিখো , লাম , লান সবকিছুরই ব্যবহার শিখো। দেখবে, তুমি হয়তো একক্ষেত্রে একরকম ব্যবহার শিখলে; তারপর ক্বুরআন নিয়ে বসো, আরো কত ক্ষেত্রে তার নিয়ম দেখবে। শিখার আগেই তোমার সেই নিয়মগুলোতে অভ্যস্ততা চলে আসবে। প্রায় একবছর হয়ে গেলো আমার 'এসো আরবি শিখি' পড়েছি; তারপর অনুশীলন বিশেষত শেষের পাঠগুলোর তেমন রিভাইসই হয়নি; অথচ এখনো ভুলে যাওয়া সম্ভব হয়নি, আমার বিশ্বাস, শুধুমাত্র ক্বুরআনের উসিলায়।
ক্বুরআন পড়ো, পড়তে থাকো, নিয়মিত পড়ো; শিখার নিয়তে পড়ো, অনুসন্ধিৎসু চোখে পড়ো। তুমি হয়তো সংজ্ঞা জানবে না, অর্থ জানবে না, তারকীব জানবে না; কিন্তু ব্যবহার শিখবে, নতুন নতুন শব্দ জানবে(অর্থ নাই জানলে), নতুন নতুন নিয়ম জেনে যাবে নিজের অজান্তেই। তারপর যখন তোমার বইয়ের পাতায় সংজ্ঞাগুলো দেখবে, দেখো কতটা সহজ, আপন আর পরিচিত লাগে!
শিক্ষার সফরে যদি ক্বুরআন হয় তামরীনরূপী সঙ্গী, আল্লাহ জানেন কতটা বরকতময় হবে সেই সফর। 

আর ক্বুরআনই যদি তোমার সফরের গন্তব্য হয়, তবে এখন থেকেই সঙ্গে থাকুক, সঙ্গী থাকুক...

শোন আল্লাহর কথা

আমাদের যত মেধা, যোগ্যতা, প্র্তিভা এর জন্য আমরা কেন প্রশংসিত হই? কেন মানুষ মানুষের প্রশংসা করে বলে, মাশাআল্লাহ আপনার অনেক মেধা। মাশাআল্লাহ বলুক যাই বলুক, এতে বেশিরভাগ সেই মানুষটারই প্রশংসা ফুটে ওঠে। আল্লাহর প্রশংসা, আল্লাহর নিয়ামতের কথা কতটুকু ফুটে উঠে?

আমাদের যে মেধা আল্লাহ ছাড়া কে দিয়েছেন? মেধা বা যোগ্যতার কতটুকু অংশে আমাদের নিজেদের হাত আছে? যদি দশমিকের পর অসীমসংখ্যক শূণ্য বসিয়ে তারপর একটা এক বসাই, এতটুকু ভগ্নাংশের যোগ্যতাও আমাদের নেই। সমস্ত প্রতিভার সেন্ট পার্সেন্ট প্রশংসা শুধু আল্লাহর, শুধুমাত্র আল্লাহরই প্রাপ্য। এতে কোন মানুষের কোন সৃষ্টির বিন্দুমাত্র কৃতিত্ব নেই। তবে কেন আমরা মানুষের অতিরিক্ত প্রশংসা করি? প্রশংসা যদি করতেই হয়, তবে তার পরিশ্রম বা চেষ্টা-মেহনতের প্রশংসা করয়া যেতে পারে(যদিও এটারও পুরো কৃতিত্ব শুধু আল্লাহরই ; তবে খানিকটা), যেহেতু চেষ্টা-মেহনতের ভার মানুষের উপর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু যেখানে শুধু আল্লাহর, শুধুই আল্লাহর কৃতিত্ব; যেখানে শত চেষ্টা করলেও কোনভাবেই মানুষকে অল্প করে হলেও কৃতিত্ব দেওয়া অসম্ভব_ সেই মেধা,যোগ্যতা বা প্রতিভার প্রশংসা কী করে আমরা মানুষের দিকে ইঙ্গিত করে দিতে পারি? বড়জোর হয়তো এতখানি যে, আলহামদুলিল্লাহ আল্লাহ কতটা মেধা দিয়েছেন তাকে; আর আমাদের তৌফিক দিয়েছেন তা থেকে উপকৃত হবার; আর আল্লাহর কুদরত, কাউকে একটুখানি মেধা দেন অথচ কাউকে অবাক করার মত মেধা দেন; আল্লাহ কতটা বড়, কতটা শক্তিশালী; আমার মেধার নিয়ন্ত্রণ তো তাঁরই হাতে। তবে কেন আমি তাঁর সামনে অবনত হই না? কেন তার প্রদত্ত নিয়ামতের বহিঃপ্রকাশ দেখে তাঁর প্রতি মাথা নত করি না? যা দিয়েছেন তাঁর শুকরিয়া করে, কেন তাঁর কাছে আরো চেয়ে নিই না? আর কেন অন্তর থেকে তাঁর গুণপনা না করে, তাঁর সৃষ্টির গুন গাই? কেন আমি এমন? কেন? আর যা দিয়েছেন, শুকরিয়া হিসেবে তা কাজে লাগাই না? এতো এমনকি আমার চেয়ে পাওয়া নিয়ামত নয়, বরং সম্পূর্ণ দান, সম্পূর্ণটাই অনুগ্রহ। অন্তর কতটা মরে গেলে কেউ পারে, আসল সত্তাকে ভালোবাসা অর্পণ না করে তাঁর সৃষ্টিকে তাঁরই প্রদত্ত নিয়ামতের জন্য তাঁকেই ভুলে গিয়ে, ভালোবাসা প্রশংসায় নিমগ্ন হয়ে যেতে?